চাকরির বাজার ও চাকরির খোঁজ

চাকরির বাজার ও চাকরির খোঁজ

 

চাকরির বাজার চাকরির খোঁজ

প্রযুক্তি, নাগরিক জীবনের বৈচিত্র্য, তদ্ভুত নতুন নতুন সমস্যা ও সেসবের সমাধানে এবং সর্বোপরি প্রযুক্তির দ্রæত পরিবর্তনের জের ধরে জীবন যাপন, জীবিকা ও পেশায় এসেছে অকল্পনীয় পরিবর্তন ও বৈচিত্র। ফলাফলে প্রতিষ্ঠানের ধরণ ও আকারও বেড়েছে অনেকখানি। কাজের সুযোগ যেমন বেড়েছে তেমন, তেমনই যন্ত্রনির্ভরতার জন্য কমেছেও মানুষের কাজ। বহু মানুষের কোদাল বেলচাকে প্রতিস্থাপিত করেছে বুলডোজার। তবে বিশ্বব্যাপী নগরায়ণের ফলে বেড়েছে বুলডোজার চালক বা অপারেটরের চাহিদাও। একই সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় বা রেফারেন্সের চাইতে ইন্টারনেট, পত্রিকা ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মী বা পেশাদার খোঁজা হচ্ছে অনেক অনেক বেশি।

অতএব, চাকরি, ব্যবসা বা যে কোন প্রয়োজনেই পত্রিকা, ইন্টারনেট (ওয়েব সাইট, ফেসবুক বা লিংক্ড-ইনের মত সামাজিক/পেশাদারী মাধ্যম বা প্লাটফর্ম) ইত্যাদিতে খোঁজ খবর রাখা আগের যে কোন সময়ের চাইতে জরুরী।

এ ছাড়াও চাকরি ও ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য আর নানা রকম সহায়তা প্রদানের জন্য রয়েছে সরকারি, বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান। সেগুলো সম্পর্কেও এই পুস্তিকা ও সহায়ক মেটেরিয়েলগুলোতে আলোচনা ও নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চাকরির প্রস্তুতি: সিভি, যোগাযোগ, আবেদন

চাকরির জন্য নিজের প্রাসঙ্গিক প্রায়োগিক দক্ষতা ও আচরণগত দক্ষতাগুলোকে নিচের টেবিল বা ছক অনুযায়ী লিখে ফেলুন। তাতে চাকরির প্রস্তুতির জন্য বায়োডাটা, কারিকুলাম ভিটা (সিভি) ইত্যাদি তৈরি করতে যেমন সুবিধা হবে তেমনি নিজের সম্পর্কে ভাসা-ভাসা ধারনার পরিবর্তে আরও পরিষ্কার ধারনা হবে যা আত্মবিশ্বাস তৈরিতে বা আত্মউন্নয়নে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে সহায়ক হবে।

নিজের যোগ্যতা যাচাই

যে কোন চাকরি বা পেশার জন্য আপনার প্রায়োগিক ও আচরণগত দক্ষতাগুলো যথাযথ মাত্রায় বা গভীরতায় আছে কি না তা বুঝতে চেষ্টা করুন। সে অনুযায়ী চাকরি, ব্যবসায় বা পেশা নির্ধারন করুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: যদি আপনি সদালাপি, হাসিখুশি ও সেবা পরায়ণ মানুষ না হন অথচ বৈদ্যুতিক লাইন তৈরি করার প্রাথমিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকে তবে আপনার পক্ষেবৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিক্রয়কারী দোকানের বিক্রয়কর্মীর কাজ না করে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজেই জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ানোর প্রতিই মনোযোগী হওয়াই শ্রেয়তর হতে পারে। অপর পক্ষে উল্লিখিত আচরণগত ও কারিগরি গুণাগুণ বা দক্ষতা থাকলে আপনি একজন বিক্রয়কর্মী হিসেবেও পেশা নির্বাচন করতে পারেন। যে কোন পেশার নানা দিকগুলো, যেমন ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদি সম্পর্কে যথাসম্ভব জেনে নিন। তাতে পরবর্তীতে হতাশাজনক পরিস্থিতি ও সময়ের অপচয় এড়ানো যাবে।

সিভি, বায়োডাটা তৈরি করা

একটি জীবনবৃত্তান্ত (CV) হচ্ছে একজন সম্ভাব্য চাকুরীদাতার কাছে একজন চাকুরীপ্রার্থী হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করার প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় চাকুরিপ্রার্থীরা তাদের জীবনবৃত্তান্ত সুন্দর এবং সঠিকভাবে তৈরী করার ব্যপারে গুরুত্ব দেন না ফলশ্রæতিতে অনেক যোগ্য প্রার্থীই ঔড়ন ওহঃবৎারবি বা চাকরির ইন্টারভিউতে ডাক পান না এবং সেসব চাকরিতে নিজের যোগ্যতা প্রমানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

আপনার জীবনবৃত্তান্ত (CV) তৈরীর আগে যে সকল বিষয়ের প্রতি নজর রাখবেন:

  • একজন চাকুরিদাতা গড়ে একটি জীবনবৃত্তান্তের উপর ৩০ সেকেন্ডের বেশি সময় দিতে পারেন না। অতএব এটি হতে হবে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত। তথ্যগুলোর উপস্থাপন হতে হবে সুস্পষ্ট। অপ্রয়োজনীয় বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিহার করতে হবে।
  • একজন অনভিজ্ঞ/সদ্য পাস করা চাকুরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত এক থেকে দুই পাতার বেশি হওয়া কোনভাবেই উচিত্ নয়।
  • আপনার জীবনবৃত্তান্ত হচ্ছে আপনার নিজেকে বিপণন বা মার্কেটিং করার মাধ্যম। সুতরাং এটি হতে হবে আকর্ষণীয়। তবে চটকদার কোন কিছু যেমন রঙিন কাগজ বা রঙিন কালি ব্যবহার করবেন না। কোন কিছু highlight করতে হলে সেটিকে bold, italic বা underline করতে পারেন।
  • মনে রাখবেন, আপনার জীবনবৃত্তান্তের মধ্যে যদি কোন বানান ভুল বা ভাষাগত, grammatical বা ব্যাকরণগত ভুল থাকে তবে সম্ভাব্য চাকুরীদাতার আপনার সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। এটিও প্রকাশ পেতে পারে যে আপনি কোন কাজই নির্ভুল ভাবে করতে সক্ষম নন। সুতরাং একটি CV তৈরীর পর সেটি নিজে ভাল করে পড়ুন এবং শুদ্ধ ইংরেজী বা বাংলা জানেন এমন ব্যক্তিকে দেখিয়ে নিন।
  • যখন আপনি কোন নির্দিষ্ট চাকুরি বিজ্ঞপ্তির (job announcement) বিপরীতে আবেদন করার জন্য জীবনবৃত্তান্ত পাঠাবেন, তখন চেষ্টা করুন আপনার CV সেই চাকুরীর চাহিদা অনুযায়ী তৈরী করতে । এ কারনে চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি ভাল করে পড়া এবং প্রতিষ্ঠানটি সম্বন্ধে কিছু গবেষণা (research) করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। উদাহরণ স্বরুপ, আপনি যদি জানেন যে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের যে কোন স্থানে নিয়োগ দিতে পারে, তাহলে আপনি আপনার CV-তে উল্লেখ করতে পারেন আপনি বাংলাদেশের কোন কোন স্থানে এর আগে বা এ পর্চন্ত অবস্থান করেছেন। অথবা কোন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এমন কোন লোক খুঁজছে যার একজন ‘সংগঠকের (organizer) ভূমিকা পালন করতে হবে, সেই ক্ষেত্রে আপনি যদি আপনার ছাত্রজীবনের কোন সাংগঠনকারীর ভূমিকা উল্লেখ করেন তবে আপনার CV নিয়োগকারীর কাছে বেশি মূল্য পাবে
  • এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি আপনার ঈঠ তে সঠিক তথ্য দেবেন। এমন কোন তথ্য দেবেন না যা আপনার job interviewতে ভুল প্রমানিত হতে পারে

 

জীবনবৃত্তান্তের বিভিন্ন অংশ

একটি জীবনবৃত্তান্তে (CV) যে তথ্যগুলো আপনি সুবিন্যস্ত ভাবে উপস্থাপন করবেন সেগুলো হচ্ছে:

শিরোনাম (title)

পেশাগত অভিজ্ঞতার সার সংক্ষেপ (career summary)।

ক্যারিয়ার উদ্দেশ্য (career objective)। এটি সদ্য কোন ডিগ্রি/পরীক্ষা পাশ করা চাকুরি প্রার্থীদের জন্য বেশি প্রয়োজন।

চাকুরির অভিজ্ঞতা (experience)

শিক্ষাগত যোগ্যতা (education)

অতিরিক্ত তথ্য (additional information)

ব্যক্তিগত তথ্য (personal information)

রেফারেন্স (reference)

চাকরি খোঁজা চাকরি সংক্রান্ত যোগাযোগ

চাকরির খোঁজ-খবর রাখা একটি জরুরী ও ক্রমাগত কাজ। দেশে ফেরত এসে নতুন করে চাকরি খোঁজা বা চাকরি হারালেই চাকরির খোঁজ-খবর শুরু করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ না। স্ব-নিয়োজিত হওয়া বা ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পর্যন্ত নিয়মিত চাকরির খোঁজ-খবর রাখা অত্যন্ত জরুরী। একটি চাকরিতে থাকা অবস্থাতেও আপনার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পছন্দ ইত্যাদি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে চাকরির বাজার বা নতুন চাকরির সুযোগের ব্যাপারে সজাগ থাকুন।

কোথায় কিভাবে চাকরি খুঁজবেন?

  • আপনার পরিচিতির বা নেটওয়ার্কের সদ্বব্যবহার করুন
  • পুরনো ক্লাসমেট/স্কুলের বন্ধু (এলামনাই) বা সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করুন
  • বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা ইভেন্টগুলোতে উপস্থিত থাকুন বা অংশগ্রহণ করুন
  • চাকরির নোটিশের বা বিজ্ঞপ্তির খোঁজ রাখুন

 

কভার লেটার/cover letter

চাকরির আবেদনপত্রের সঙ্গে আজকাল বেশিরভাগ কোম্পানিই কভার লেটারও দিতে বলে। যারা সুস্পষ্টভাবে কভার লেটার দিতে বলেন না তারা সিভি পাঠানোর সময় আবেদনকারী যে চিঠি বা ইমেইলটি লিখেন সেটিকেই কভার লেটার বলে বিবেচনা করেন।

কভার লেটার কী?

সহজে কভার লেটার কি বোঝার জন্য আসুন ‘কভার লেটার’ শব্দটিকে আমরা ভেঙে ফেলি। ভাঙলে আমরা কি পাই? কভার+লেটার। তার মানে হল যে লেটার আপনার চাকরির আবেদনের যাবতীয় দিক সম্পর্কে আলোকপাত বা ঈড়াবৎ করে তাকে কভার লেটার বলে।

এবার আলোচনা করা যাক ‘যাবতীয় দিক’ মানে কি?

যাবতীয় দিক মানে হচ্ছে নিন্মোক্ত ৬টি দিক :

১.      কোথা থেকে চাকরিটির খোঁজ পেয়েছেন? (একবাক্যে লিখুন)

২.      আপনাকে পরিচিত করান : এখানে আপনি দুটি বাক্য লিখবেন। এর মাঝে নিজেকে তুলে ধরুন। আপনি কি কি কাজ করছেন লিখুন। পড়াশোনা যদি তুলনামূলকভাবে কমও হয়ে থাকে (ধরা যাক পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণী) সে ক্ষেত্রে পড়াশোনার সাথে সঙ্গীত চর্চা, খেলাধুলা, নাটক বা অন্যান্য দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করুন।

৩.      আপনি যে পদের জন্য আবেদন করছেন, সেই পদের জন্য যে কাজগুলোর কথা সার্কুলারে/চাকরির বিজ্ঞাপনে লেখা আছে তার সঙ্গে আপনার বর্তমান বা অতীতের কাজ ও অভিজ্ঞতার যোগসূত্র তুলে ধরুন।

৪.      আপনার শিক্ষাগত দিক/যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণগুলোর কথা উল্লেখ করুন

৫.      আপনাকে কেন ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা উচিত হবে তা লিখুন। কেন এই চাকরির জন্য অন্য কারো চাইতে নিজেকে যোগ্যতর বা সেরা মনে করেন? কভার লেটারে কোন করুণা উদ্রেককারী লেখা লেখা থেকে বিরত থাকুন। এতে শুধুই যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ করার মানসিকতার প্রতিফলন থাকা উচিত।

৬.      আপনাকে যদি সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকলে আপনি যে আসবেন বা আরও তথ্যের জন্য ফোনে বা ইমেইলে আপনার সাথে যোগাযোগ করা যাবে এমন ইতিবাচক একটি বাক্য লিখে কভার লেটার শেষ করুন।

সুতরাং, আপনার তথ্যসূত্র+আপনার পরিচয়+আপনার অভিজ্ঞতা+লেখাপড়া+আপনার সম্ভাবনা+আপনার প্রাপ্যতা, এই সব মিলেই হলো আপনার কভার লেটার।

অনেক প্রতিষ্ঠানই কভার লেটার ছাড়া আবেদনপত্র গ্রহণ করেন না। অনেকে কভার লেটারকে সিভির সারাংশ বলে থাকেন।

কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বা শেষে ইন্টার্নশিপ, ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট, থিসিস, প্রজেক্ট, কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিগুলো উল্লেখ করে উপর্যুক্ত দুই ও তিন নম্বর পয়েন্ট দুটি পূরণ করুন।